নভেম্বর ২৮, ২০২১

জাহাজে পণ্য রফতানিতে সংকট

জাহাজে পণ্য রফতানিতে সংকট
  • রফতানির সবচেয়ে বড় মাধ্যম নৌপথ
  • সমুদ্রপথে ভাড়া বেড়েছে ছয়গুণ
  • বেশি ভাড়াতেও মিলছে না কনটেইনার

দেশের নানামুখী পণ্য রফতানির সবচেয়ে বড় মাধ্যম নৌপথ। নৌপথে বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশে পণ্য যাচ্ছে। বর্তমানে পণ্য পরিবহনের তিন পথেই ভাড়া বাড়লেও নৌপথে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী বেড়েছে জাহাজে পণ্য পরিবহনের ভাড়া। তবে দেশে শিপিং লাইনগুলো চীন-হংকংভিত্তিক হওয়ায় ভাড়া কয়েকগুণ বেড়েছে। দেশে অন্যান্য শিপিং লাইন থাকলে সেবার মানও বাড়তো। পণ্য প্রক্রিয়াজাতকারীরা সুবিধা পেতেন রফতানিকারকরা।

তারা বলছেন, কনটেইনার ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ২৫ টাকার মতো বেড়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে রফতানি বন্ধ করে দিতে হবে। অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে টেকা যাবে না। করোনার সংক্রমণ কিছুটা কমে আসার পর থেকেই বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় জট লেগে গেছে। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জাহাজে পণ্য পরিবহনের ভাড়া আকাশ ছুঁয়েছে। বিশ্বের আটটি প্রধান রুটে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার পরিবহনের খরচ এক বছরের ব্যবধানে ৩৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে পণ্য পরিবহনে সেটা বেড়েছে তারও দ্বিগুণ।

শেষ দফায় দুবাইয়ে বিস্কুট ও স্ন্যাকস রফতানি করেছে বনফুল অ্যান্ড কিষোয়ান গ্রুপ। ৪০ ফুটের একেকটি কনটেইনারে গেছে প্রায় ১০ টন করে পণ্য। এজন্য কনটেইনারপ্রতি ভাড়া গুনতে হয়েছে তিন হাজার ২০০ ডলার, যা করোনা হানা দেওয়ার আগেও ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ ডলারের মধ্যে। জাহাজে ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনেরও (বাপা) তথ্যে। তাদের তথ্য বলছে, ৪০ ফুটের একটি কনটেইনারে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বর্তমানে ভাড়া গুনতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৭ হাজার ডলার, যা করোনার আগে (২০১৯ সাল) সাড়ে তিন থেকে চার হাজার ডলার ছিল।

সংগঠনটির তথ্য আরও বলছে, অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ১২শ থেকে ১৫শ ডলারের কনটেইনার ভাড়া এখন সাড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার ২০০ ডলার। কাছাকাছি দূরত্বে সৌদি আরব পর্যন্ত ১২০০ থেকে ১৫০০ ডলারের কনটেইনার এখন ৭ থেকে ৯ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছে। খালি কনটেইনার পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে রফতানিতে দেরি হচ্ছে। এতে খরচও বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পণ্য যথাসময়ে পাঠানো যাচ্ছে না। কারও কারও ক্রয়াদেশ বাতিলও হচ্ছে।

কয়েকজন রফতানিকারক জানান, বাংলাদেশে জাহাজে পণ্য পরিবহন ব্যবসা আছে চীন ও হংকংভিত্তিক কোম্পানিগুলোর। বর্তমানে চীনের সাংহাইয়ের বন্দরের একটি টার্মিনাল বন্ধ। ফলে চীন থেকে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক মাস ধরে শুধু বাড়ছে। পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী সময়ে চীন তাদের নিজস্ব পণ্যের চাপ অনেক বাড়িয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশে কনটেইনার সেবা ঠিকঠাক দিতে পারছে না কোম্পানিগুলো। সংকটের কারণে ভাড়াও বেড়েছে অনেক বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্শ্ববর্তী ভারতের নিজস্ব জাহাজ রয়েছে। তারা নিজেদের পণ্য পরিবহন প্রাধান্য দিচ্ছে। এজন্য সে দেশে ভাড়া বৃদ্ধির হারও কম। অন্যদিকে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় ছোট জাহাজে ট্রান্সশিপমেন্টে খরচ বেশি হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর সর্বাধুনিক না হওয়ায় এখানে কার্যক্রম চালাতে আগ্রহ কম দেখাচ্ছে বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলো।

সূত্রমতে, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান। রফতানি করছে ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ২০টি। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানিতে বর্তমানে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। আশির দশকে শুরু হওয়া রফতানি কার্যক্রম বর্তমানে ১৪৫টি দেশে পৌঁছে গেছে। ফ্রুট ড্রিংক, পানীয়, বিস্কুট, সস, নুডলস, জেলি, মসলা, সরিষার তেল, আচার, সুগন্ধি চাল, পটেটো ক্র্যাকার্স, চানাচুর, ঝাল-মুড়ি ইত্যাদি পণ্য রফতানি হচ্ছে বেশি। এসব পণ্যের ৯৫ শতাংশ জাহাজে রফতানি হয়।

কনটেইনার সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুগছে দেশের প্রধান রফতানিখাত পোশাকশিল্প। করোনা পরিস্থিতির কারণে রফতানিখাতে সৃষ্ট সমস্যা দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়ে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও চট্টগ্রাম বন্দরে। এছাড়া এ বিষয়ে অর্থ, বাণিজ্য ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়েও তারা চিঠি দিয়েছে।

দ্রুত সমাধান চেয়ে চিঠিতে বলা হয়, দেশের রফতানি পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোয় যাচ্ছে। সেসব দেশ করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোদমে শুরু হয়েছে। এ সময় কনটেইনার সংকট ও অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশের পোশাকশিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে। এ ধরনের সংকট এড়াতে এখনই জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই। রফতানির সবচেয়ে বড় কারবার হয় জাহাজের মাধ্যমে, বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশে পণ্য যাচ্ছে নৌপথে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলছেন, বাড়তি জাহাজ ভাড়ার কারণে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু এ ভাড়া বিদেশি শিপিং এজেন্ট, তাদের দেশি প্রতিনিধি এবং এজেন্সিগুলোর ওপর নির্ভর করে। সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ চাইলেও সহজে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কনটেইনার ও জাহাজ জট নিয়ে যে পরিস্থিতি বা সংকট তৈরি হয়েছে, এটি চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো সংকট নয়।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের পত্রিকা
ই-পেপার
শেয়ার বাজার
পন্য বাজার