নভেম্বর ২৮, ২০২১

করোনার পরে কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

বিশ্ববাজারে দাম কমেছে ডলারের
বিশ্ববাজারে দাম কমেছে ডলারের


দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম রেমিট্যান্স। মহামারি করোনার সময়ে রেমিট্যান্স বাড়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে করোনার পরে বিশ্বব্যাপী চলাচল আবার স্বাভাবিক হওয়ায় কমতে শুরু করেছে রেমিট্যান্স।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সময়ে অর্থ পাঠাতে আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করতে সবাই বাধ্য ছিল। সেসময় ব্যাংকিং তথা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বাইরে অন্য সবকিছু বন্ধ ছিল। এজন্য সেসময় রেমিট্যান্স বাড়ছিল। অন্যদিকে করোনার পরে লকডাউন উঠে যাওয়া বা আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করছেন বলে তারা আশঙ্কা করছেন। এছাড়া করোনার কারণে গত এক বছরে অনেক কর্মী বিদেশে যেতে পারেনি। যা রেমিট্যান্সের উপর প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক কমেছে ২০ শতাংশ। মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যেও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ (২৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ছিল আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ (এক দশমিক ৬৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে) যার পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। যা গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন আয়। এর আগে গত বছরের মে মাসের পরে এক মাসে এত কম রেমিট্যান্স আর আসেনি। ওই মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, করোনার সময়ে প্রবাসীরা তাদের সঞ্চয় দেশে পাঠিয়েছেন। ওই সময়ে যারা কাজ হারিয়েছেন তারা তাদের সমস্ত উপার্জন একসঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে সেটা ছিল এককালীন। বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। করোনার সময়ে দেশ থেকে বিদেশে কোন কর্মী যেতে পারেনি। সময় মিলিয়ে রেমিট্যান্স কমেছে। তবে করোনার পরে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা কমে অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার হচ্ছে বলে আশঙ্কার কথা জানান তিনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বেশি ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, করো মহামারির মধ্যে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল চমকপ্রদ। ওই সময়ের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে অনেকে বিস্মিত হয়েছিলেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ওই সময়ে সব ধরনের অর্থ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে আসছিল। যাতায়াতের বিধিনিষেধ ও বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি কার্যত বন্ধ থাকার কারণে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছিল না। তবে করোনার পরে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলো বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর আবারো চালু হয়েছে। এতে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে।

এখনো পর্যন্ত অল্প কয়েকটি দেশ থেকেই রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসছে। আমাদের দেশের রেমিট্যান্স এখনো মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর রেমিট্যান্স আসছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এদেশ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশে সিংহভাগ রেমিট্যান্স এসেছে পাঁচটি দেশ থেকে। এ সময়ে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্য এ পাঁচ দেশ থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৩৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এ পাঁচ দেশসহ রেমিট্যান্স পাঠানো শীর্ষ ১০টি দেশ হলো: সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, ওমান, কাতার, ইতালি ও সিঙ্গাপুর।

বিশ্বের ১৬৮ দেশে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বসবাস করেন। বাংলাদেশের প্রবাসীদের সব চেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২২ লাখের মতো বাংলাদেশি অভিবাসী সৌদি আরবে কর্মরত আছেন। তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। চলতি অর্থবছরের চার মাসে দেশটি থেকে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৭০ কোটি ডলার। আর এ সময়ে রেমিট্যান্স আহরণের দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১১৫ কোটি ২১ লাখ ডলার।

যারা রেমিট্যান্স পাঠান তারা নীরবে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। অথচ তাদের জন্য দেশের পক্ষ থেকে কিছুই করা হচ্ছে না। উল্টো বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদেরকে হেনস্তা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নামকাস্তে প্রতিবছর রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড দিলেও অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তরা তেমন কোন সুবিধা পান না।

সাম্প্রতিক এক তথ্যে দেখা গেছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ১০টি জেলার মানুষ বেশি প্রবাস জীবন কাটায়। এ দশ দেশ হলো কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, ঢাকা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী এবং ফেনী। জানা গেছে, কুমিল্লা থেকে মোট ৬ লাখ ১৯ হাজার ১৩৮ জন বিদেশ গেছেন। চট্টগ্রাম জেলা থেকে আছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ৭০৯ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮১ জন লোক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। টাঙ্গাইল থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার ৭১৭ জন বিদেশে অবস্থান করছেন। জেলার মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ঢাকা। এই জেলার ২ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩৪ জন দেশের বাইরে বসবাস করছেন। চাঁদপুর জেলা থেকে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৪ জন বিদেশ রয়েছেন। এছাড়া নোয়াখালী থেকে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৩ জন, মুন্সীগঞ্জ থেকে এক লাখ ৭৩ হাজার ৪৭৭ জন, নরসিংদী থেকে এক লাখ ৫৯ হাজার ৩৮৪ জন এবং ফেনী থেকে এক লাখ ৫৬ হাজার ১৯৯ জন বিদেশে থাকেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। বৈধ উপায়ে প্রবাসী আয় বাড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সে অনুযায়ী, ওই অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে ২ টাকা প্রণোদনা পেয়ে আসছেন।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের পত্রিকা
ই-পেপার
শেয়ার বাজার
পন্য বাজার