ডিসেম্বর ১, ২০২১

অর্থনীতির দৌড় কমাবে তেল

অর্থনীতির দৌড় কমাবে তেল

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির ঢেউ বাংলাদেশে আছড়ে পড়লেও লণ্ডভণ্ড করতে পারেনি অর্থনীতির গতিকে। অনেক খাতে করোনার ভয়াবহতার মধ্যেও বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চাঙা হয়ে উঠেছে। সচল হচ্ছে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

তবে বিশ্বাবাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার ঢেউ এসেছে লেগেছে দেশের অর্থনীতিতেও। এতে কিছুটা থমকে যেতে পারে অর্থনীতির দৌড়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ অর্থনীতির দৌড় কিছুটা থমকে যেতে পারে। বিশেষ করে পণ্য বাজারে ধাক্কাটা বেশি লাগতে পারে। সব ধরণের পণ্যের বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে।

দুই দফা করোনার ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, ঠিক সে সময় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির যে চাপ সৃষ্টি করবে তা মোকাবেলা করা নিয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি একটি স্পর্শকাতর পণ্য। যার দাম বাড়ার প্রভাব অর্থনীতিতে সূদরপ্রসারী। জীবনযাত্রাকে এটি নানাভাবে প্রভাবিত করে। এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। বেড়েছে পরিবহন ভাড়া।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন ডিজেল, কোরোসিনের দাম বাড়ায় ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। যেহেতু তাদের আয় বাড়েনি, তখন বাধ্য হয়ে তারা ব্যয় সংকোচন করে। ফলে মানুষের ভোগ ব্যয় হ্রাস পায়। সংকুচিত হয় অর্থনীতি। ব্যাহত হয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি। গেল বুধবার মধ্যরাতে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটার প্রতি ১৫ টাকা বা ২৩ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম নির্ধারণ করা হয় ৮০ টাকা, যা আগে ছিল ৬৫ টাকা। বর্তমানে কৃষিখাতে ডিজেলের ব্যবহার ১৬ শতাংশ। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচের খরচ বাড়বে। এতে করে বাড়বে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ। বিদ্যুতে ডিজেলের ব্যবহার ২৬ শতাংশ। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ডিজেল ও ফার্নেস তেলচালিত। ফলে বিদ্যুতের দাম ও বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  খুচরায় বাড়ছে জিরা-এলাচের দাম

যেকোনো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি জ্বালানি। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির গুরুত্ব তাই বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানির কারণে পররাষ্ট্রনীতিরও পরিবর্তন ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি দাম বৃদ্ধি যেকোনো দেশের গোটা অর্থনীতির জন্যই অশনী সংকতে। তবে এই পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই যেকোনো দেশের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে রাজস্ব আহরণে ভাটা পড়বে। কারণ, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে ভোগ ব্যয় হ্রাস পায়। এতে করে অর্থনীতি সংকুচিত হয়। আর অর্থনীতি সংকুচিত হলে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ও আয়কর আহরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত। এতে পণ্য মূলের ক্রয়ক্ষমতার হিসেবে মানুষের বেতনের অবমূল্যায়ন ঘটবে। অর্থাৎ করোনার পর মানুষের আয় আরেক দফা কমে যাবে। এমনিতেই বেকারত্ব, নতুন দারিদ্র্যে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। নিম্নবিত্ত এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষুধার কষ্টও শুরু হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোর ফলে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে।

জ্বালানি বিশেষেজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। কমবে ভোগ ব্যয়। সংকুচিত হবে অর্থনীতি। এর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

গেল দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার যেমন বড় হয়েছে, তেমনি বিনিয়োগের ক্ষেত্রও বেড়েছে। করোনার ভয়াবহতার মধ্যে যখন গোটা বিশ্বের অর্থনীতিই হুমকির মুখে পড়েছে, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। বিশেষ খাতগুলোতে বরং বিদেশি বিনিয়োগের ঢল নামতে দেখা গেছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও তেমন হেরফের হয়নি। বরাবরই রেমিটেন্সের গতি ছিল স্বাভাবিক। তবে সম্প্রতি জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে অর্থনীতির দৌড় খানিকটা কমে যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানির ওপর কম কমানো একটা উপায় হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  বড় উত্থানের পথে পুঁজিবাজার

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের পত্রিকা
ই-পেপার
শেয়ার বাজার
পন্য বাজার